বড় মেয়ে লামিয়া চৌধুরী তাঁর স্বামী-সন্তানসহ কানাডায় থাকেন
জীবনসায়াহ্নে এসে নাজমা চৌধুরী নিজেকে সুখী মনে করেন
তাঁর স্বামী সাবেক প্রধান বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরী ও মা-বাবার অনুপ্রেরণা উৎসাহ ও সহযোগিতায় আজ তিনি মা হিসেবে নারী হিসেবে ও মানুষ হিসেবে সফল
তিনি চান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে যেন সহমর্মিতা থাকে
নারীরা যেন তাঁদের আত্মসম্মান বজায় রাখেন
কারও মুখাপেক্ষী না হন
বিশেষ রচনা
তুষারের দেশে অভিযান
সাদা তুষারে ঢেকে আছে চারপাশটা
তুলোর মতো ঝরছে আকাশ থেকে
চোখ যায় যত দূর শুধু হিমশীতল বরফ
সাদা আর সাদা
এ সময়টায় রোদের জন্য মনটা আইঢাই করে
কুসুমগরম রোদ
সঙ্গে যদি জুটে যায় এক কাপ কফি তবে তো সোনায় সোহাগা
কিন্তু এমনটা হওয়ার উপায় নেই
দক্ষিণ মেরুতে এসে কেউ এমন বায়নাক্কা জুড়লে তাকে যে সবাই পাগল ঠাওরাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই
ফেলিসিটি অ্যাস্টন তার পরও এসব নিয়ে ভাবেন
তাঁর মনে হয় হঠাৎ করে সূর্যটা এসে নামবে দূরের মস্ত বরফের চূড়াটায়
তাপ দিয়ে গলিয়ে দেবে সব বরফ
এরপর সেই বরফের আড়াল থেকেই জেগে উঠবে সবুজ গাছপালা
একটানা বরফের মধ্যে থাকলে এমন সব পাগলামো মাথায় চেপে বসে এটা ভালো করেই জানা অ্যাস্টনের
দক্ষিণ মেরুতে এখন গ্রীষ্মকাল
সূর্য তাই বিমুখ করেনি অ্যাস্টন ও তাঁর দলে থাকা সাতজন নারীকে
এখন ২৪ ঘণ্টাই দিনের আলো থাকে
চলাফেরায় তাই খুব একটা সমস্যা হয় না
অ্যাস্টন হাঁটতে থাকেন তাঁর দল নিয়ে
৪০টি দিন পার করতে হবে এখানে
বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ বড্ড কম
এর পরও বিপদের কোনো শেষ নেই
সতর্ক থাকতে হয় সব সময়
কখন যে কী হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না
হাঁপিয়ে উঠেছে সবাই
তাপমাত্রা নেমে গেছে অনেক
এমন অবস্থায় কোনো কিছুতে মনঃসংযোগ ধরে রাখা খুব কঠিন
হঠাৎ করে শোনা যায় বরফে ফাটল ধরার শব্দ
চিড় ধরেছে কি কোথাও! কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাতলা বরফ ভেঙে শীতল জলে ডুবে যেতে থাকে একটা মেয়ে
ধীরে ধীরে হয়ে যায় চোখের আড়াল
বিচলিত না হয়ে দলের প্রধান হিসেবে কীভাবে মেয়েটার জীবন বাঁচানো যায় তা ভাবতে থাকেন অ্যাস্টন
২
ফেলিসিটি অ্যাস্টন একজন আবহাওয়াবিজ্ঞানী
পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর দারুণ দখল
মাত্র ২৩ বছর বয়সে শুরু করেন চাকরি
বড্ড সাহসী
দস্যিপনায় জুড়ি নেই তাঁর
এর ধকলও কম পোহাতে হয়নি তাঁকে
সড়ক দুর্ঘটনায় একবার মস্তিষ্কে আঘাত পেয়ে কিছুদিনের জন্য পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিলেন
অনেক চিকিৎসা এবং নিজের চেষ্টায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৬ বছর বয়সে আবার সুস্থ হয়ে হাঁটতে শুরু করেন অ্যাস্টন
কমনওয়েলথের জন্মদিনে হুট করেই ডাক পড়ে তাঁর
জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য শুরু করা হবে এক অভিযান
দক্ষিণ মেরুতে কাটাতে হবে টানা ৪০টি দিন
ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে নির্বাচণ করা হয়েছে আটজন নারীকে
আবহাওয়াবিজ্ঞানী অ্যাস্টন হবেন তাঁদের দলনেত্রী
নিজেদের দেশের সংস্কৃতি বিশ্বাস এবং ভাষার আদান-প্রদানের জন্য এ এক দারুণ উদ্যোগ
অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে নরওয়েতে শুরু হয় কঠিন এক অনুশীলন
শুরুতে উচ্ছ্বসিত ছিল সবাই
অভিযানের সব বিপদের কথা ধীরে ধীরে আঁচ করতে পেরে তাতে ঘাটতি পড়ে কিছুটা
তবে সাহসের কমতি ছিল না কারোরই
সফল হতেই হবে এমন ভাবনা থেকে অনুশীলনের জন্য কঠোর পরিশ্রম শুরু করি আমরা
বলছিলেন অ্যাস্টন
ফ্রস্টবাইট হাইপোথারমিয়া এবং আর্কটিক শক সম্পর্কে শেখানো হয় তাঁদের
মাইনাস ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা পান সবাই
অনুশীলন শেষে দিনক্ষণ ঠিক করে শুরু হয় যাত্রা
দেশের মানুষদের কাছ থেকে নেওয়া হয় বিদায়
সন্দেহ নেই হাজারো বিপদ ওত পেতে আছে দক্ষিণ মেরুতে
কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসায় দুঃসাহসী এ আটজন নারী যেন এখন আর এসবের তোয়াক্কাই করেন না
৩
সেদিন বেঁচে যায় মেয়েটি
অ্যাস্টনের কাছ থেকে মাত্র ছয় মিটার সামনে ছিল সে
জলে পড়ে বাঁচার জন্য চেষ্টা করছিল শক্ত কোনো বরফের চাঁই আঁকড়ে ধরতে
কিন্তু পায়নি
বুদ্ধিমতী অ্যাস্টন অল্প সময়ের মধ্যেই ছুটে আসেন তাঁর কাছে
পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলে মেয়েটিকে
জায়গাটিতে বরফ এতই পাতলা ছিল যে দুজনেরই জলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল
অ্যাস্টন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন
কাছেই চোখে পড়ে মাঝারি আকারের এক বরফের টুকরো
মেয়েটার ভর সইতে পারবে এমনটা নিশ্চিত হয়েই জল থেকে টেনে ওপরে আনা হয় মেয়েটিকে
এ কাজে সাহায্য করে অন্যরাও
বেঁচে যায় মেয়েটি
এমন ছোট-বড় অসংখ্য বিপদের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়েছে একেকটা দিন
তাই বলে ভেঙে পড়েননি কেউ
হারাননি সাহস
দেশের কথা ভেবে সয়ে গিয়েছেন সব কষ্ট
তাঁদের থাকতে হয়েছে তাঁবুতে
খাবার ছিল শুধু চা আর বিস্কিট
কষ্টের পাশাপাশি আনন্দও কম ছিল না
একসঙ্গে থেকে খুব সহজেই তাঁরা ভুলে যেতেন সব বিপদের কথা
নিজেদের মাঝে অনেক অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলতাম আমরা
শোনা হতো প্রত্যেকের নিজ নিজ দেশ আর সেখানকার মানুষের মজার সব গল্প
সারা দিনের ধকল সামলাতে তখন আর বেগ পেতে হতো না একটুও
দক্ষিণ মেরুতে কাটানো দিনগুলোর কথা এভাবেই বলছিলেন অ্যাস্টন
গত বছরের ডিসেম্বরের ২৯ তারিখ শেষ হয় পথচলা
৪০ দিনের অভিযান দুদিন আগেই শেষ করে ফেলে এ অভিযাত্রীরা
বরফের পাহাড় ডিঙিয়ে একটানা কষ্টের পর জয় করে মস্ত এক তুষারের দেশ
বিপদ কখনোই পিছু ছাড়েনি ফেলিসিটি অ্যাস্টনের
তাই বলে দুঃখ নেই তাঁর একটুও
বিপদের সঙ্গে লড়াই করে জেতার আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা চলে না
তাই তো নিজের দলের সফলতায় গর্বিত এই আবহাওয়া বিজ্ঞানী সুযোগ পেলেই আবার নতুন কোনো অভিযানে ছুটে যেতে চান
জয় করতে চান অজানাকে
ওয়েবসাইট অবলম্বনে কিঙ্কর আহ্সান
